প্যারাডক্স কি? ২০ টি বিখ্যাত প্যারাডক্স এর উদাহরণ

প্যারাডক্স কি? ২০ টি বিখ্যাত প্যারাডক্স এর উদাহরণ
Image by Wisilife

প্যারাডক্স কি?

প্যারাডক্স শব্দের আভিধানিক অর্থ হল কূটাভাস। অর্থাৎ এমন কিছু বাক্য বা উক্তি যা থেকে নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। এসকল বাক্যের অর্থ বের করতে গেলে সাধারণত দুটি পরস্পর বিরোধী সমাধান পাওয়া যায় যার কোনটিকে সম্পূর্ণ সত্য বা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলা যায় না। এমন দুটি সমাধানের একটি সত্য হলে অন্যটি মিথ্যা হয় আবার একটি মিথ্যা হলে অন্যটি সত্য হয়। আবার এমন কিছু প্যারাডক্স আছে যার কোন সমাধানই নেই কিংবা জটিল কোন দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে। এই ধরনের বিভ্রান্তিকর গাণিতিক বা দার্শনিক বাক্যকেই প্যারাডক্স বলে।

ইতিহাসে বিখ্যাত এমন অনেক প্যারাডক্স আছে। যার কোন কোন প্যারাডক্স এতটাই বিভ্রান্তিকর যে আপনার মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে এই বিভ্রান্তিকর উত্তরের জন্যই প্যারাডক্স মানুষের কাছে এতটা জনপ্রিয়। বিজ্ঞান থেকে শুরু করে গণিত কিংবা বিভিন্ন দার্শনিক প্যারাডক্স যুগের পর যুগ ধরে মানুষের কাছে আগ্রহের বিন্দু হয়ে এসেছে। আজ আমরা এমনই ইতিহাস বিখ্যাত ২০ টি প্যারাডক্স সম্পর্কে জানব।


১। গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স

সাইন্স ফিকশন সিনেমা বা উপন্যাসে আমরা হরহামেশা টাইম ট্রাভেল দেখে থাকি। প্রযুক্তি ব্যাবহার করে অতিতে কিংবা ভবিষ্যতে যাওয়াই মূলত টাইম ট্রাভেল। যদিও এখন পর্যন্ত টাইম ট্রাভেল শুধু সিনেমার পর্দা বা বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এখনো এটি সম্ভব হয়ে উঠে নি। তাত্ত্বিক ভাবে অনেক বিজ্ঞানী টাইম ট্রাভেল সম্ভব বলেও মনে করে থাকেন। তবে মজার ব্যাপার হল টাইম ট্রাভেল সম্ভব হলে তৈরি হবে অদ্ভুত কিছু জটিলতার। এমনই একটি জটিলতা হল গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স।

ধরুন আপনি টাইম ট্রাভেল করে অতিতে ফিরে গেলেন। এমন এক সময় পৌঁছালেন যখন আপনার বাবার জন্মই হয় নি। এবার আপনি আপনার দাদাকে খুঁজে বের করে আপনার পিতার জন্মের পূর্বেই যদি তাঁকে হত্যা করেন তাহলে হিসাব অনুযায়ী আপনার পিতার জন্মই হয় নি। আর আপনার পিতার জন্ম না হলে আপনারও জন্ম হবে না। এখন আপনার যদি জন্মই না হয় তাহলে অতিতে গিয়ে আপনার দাদাকে হত্যা করল কে?

কি? প্যারাডক্স এর অর্থের সাথে মিল পাচ্ছেন?


২। জেনোর প্যারাডক্স

জেনো ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ৫ শতকের একজন দার্শনিক। তিনি জেনো অব এলিয়া নামেও পরিচিত। তার একটি বিখ্যাত প্যারাডক্স ছিল একিলিস ও কচ্ছপের দৌড়।

ধরুন, একটি নির্দিষ্ট স্থানে গ্রীক বীর একিলিস ও একটি কচ্ছপের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। যেহেতু একিলিস দ্রুত দৌড়াতে পারে, তাই কচ্ছপের প্রতি যেন অবিচার না হয়, সেজন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হল কচ্ছপকে কিছুটা সামনে থেকে দৌড় শুরু করার সুযোগ দেওয়া হবে। ধরা যাক, কচ্ছপ একিলিসের চেয়ে ৫০০ মিটার সামনে থেকে দৌড় করল।

বাস্তবিক-ভাবে চিন্তা করলে, একিলিস খুব সহজেই কচ্ছপটিকে অতিক্রম করে প্রতিযোগিতা জিতে যাবে। তবে ঠিক এখানেই চলে আসে মূল প্যারাডক্সটি।

প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই একিলিস অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই ৫০০ মিটার অতিক্রম করে কচ্ছপের পূর্বের স্থানে চলে আসবে। কিন্তু ততক্ষণে কচ্ছপ তার স্বাভাবিক ধীর গতিতে কিছুটা হলেও দূরত্ব অতিক্রম করবে। মনে করা যাক, কচ্ছপ এই সময়ে মাত্র ৫০ মিটার পথ অতিক্রম করল। এই ৫০ মিটার পথ অতিক্রম করতে একিলিসের আরও কম সময় লাগবে। কিন্তু ততক্ষণে কচ্ছপ আরও ৫ মিটার এগিয়ে যাবে।

এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে এবং একিলিস যতোই কচ্ছপের কাছে আসার পূর্বেই কচ্ছপ অতিক্ষুদ্র দূরত্ব হলেও অতিক্রম করবে। অর্থাৎ জেনোর প্রস্তাব অনুযায়ী একিলিসের পক্ষে কখনোই কচ্ছপকে ছাড়িয়ে সামনে যাওয়া সম্ভব হবে না।


৩। ডিকোটোমি প্যারাডক্স

ডিকোটোমি প্যারাডক্সটিও দার্শনিক জেনোর দেওয়া। ধরুন আপনি কোথাও যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন। আপনি একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য ঠিক করে বাসা থেকে বের হলেন। এখন ধরে নিন কিছু সময় পর নির্দিষ্ট গন্তব্যের অর্ধেক পথ বা ১/২ অংশ অতিক্রম করলেন। এরপর বাকি অর্ধেক পথ অতিক্রম করার জন্য আপনাকে অবশ্যই এই পথের ১/২ অতিক্রম করতে হবে, যা সম্পূর্ণ পথের ১/৪ অংশ। এভাবে আপনি প্রতিবার বাকি রাস্তার অর্ধেক করে পৌছাতে থাকলে যথাক্রমে সম্পূর্ণ রাস্তার ১/৮ অংশ, ১/১৬ অংশ, ১/৩২ অংশ......... করে পৌছাতে থাকবেন। তাহলে ব্যাপারটি কি দাঁড়াল? যে আপনি কোন ভাবেই সম্পূর্ণ পথ মানে ১ অংশ পথ শেষ করতে পারছেন না। অর্থাৎ আপনি আপনার গন্তব্যে কখনোই পৌছাতে পারবেন না।


৪। মিথ্যাবাদী প্যারাডক্স

প্যারাডক্সটির আবির্ভাব মূলত খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকের গ্রিক দার্শনিক এপিমেনাইডেস এর একটি বিখ্যাত উক্তিকে কেন্দ্র করে। তিনি ছিলেন ক্রিটের নাগরিক। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা ছিল “ক্রিটের সকল নাগরিক মিথ্যাবাদী”।

এক্ষেত্রে যদি কথাটাকে সত্য ধরা হয়, তাহলে তিনি নিজেও মিথ্যাবাদী। কারণ তার বসবাস ক্রিটের বাইরে না। তার মানে তার কথাটাও মিথ্যা। আবার তিনি যদি মিথ্যা কথা বলে থাকেন তাহলে ক্রিটের সকল নাগরিক মিথ্যাবাদী নয়। মানে তিনিও মিথ্যা বাদী নন, যা বলেছেন সত্য বলেছেন। যদি তিনি সত্যই বলে থাকেন তাহলে ব্যাখ্যাটি আবার শুরু থেকে পড়ুন। কি? কোন উত্তরে পৌছাতে পেরেছেন?


৫। সিপ অফ থেসিয়াস প্যারাডক্স

ধরুন আপনার একটি কাঠের তৈরি জাহাজ আছে। যেহেতু জাহাজটি কাঠের তৈরি তাই অবশ্যই এটি অনেকগুলো কাঠের টুকরো যুক্ত করে তৈরি। এখন ধরুন জাহাজটি অনেক দিনের পুরনো। তাহলে অবশ্যই আপনি এর ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের অংশগুলো নতুন কাঠের পাটাতন দিয়ে প্রতিস্থাপন করে জাহাজটি মেরামত করবেন। স্বাভবিকভাবেই এটি সেই পুরানো জাহাজটিই রয়েছে শুধু আপনি কিছু মেরামত করেছেন। কেউ নিশ্চয়ই এটিকে নতুন জাহাজ বলবে না।

কিন্তু আপনি যদি জাহাজের প্রতিটি পুরাতন কাঠের পাটাতন কে নতুন কাঠ দিয়ে প্রতিস্থাপন করেন তাহলে?


৬। রাসেল'স প্যারাডক্স

যে শব্দগুলো নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারে তাদের Autological শব্দ বলে। যেমন noun নিজেও একটি noun। আবার যে শব্দগুলো নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারে না তাদের Heterological শব্দ বলে। যেমন verb নিজে কিন্তু verb না, একটি noun। এখন প্রশ্ন হল heterological শব্দটি কি নিজে heterological?

আপনার উত্তর যদি "হ্যাঁ" হয়, তার মানে heterological শব্দটি নিজে heterological। কিন্তু সেটি যদি হয় তাহলে শব্দটি নিজেকে ব্যাখ্যা করতে পারছে। কিন্তু আমরা তো জানি যে শব্দগুলো নিজেদের ব্যাখ্যা করতে পারে তারা Autological।

আবার আপনার উত্তর যদি "না" হয়, তার মানে heterological শব্দটি নিজে heterological নয়, autological। আর autological হলে সে নিজেকে নিজে ব্যাখ্যা করতে পারবে, যা কিনা heterological এর সংজ্ঞার বিপরীত।


৭। সরাইটিজ প্যারাডক্স

ধরা যাক, একটি চাল পড়ে আছে মাটিতে। আপনি নিশ্চয়ই একে চালের স্তূপ বলবে না। এবার আপনি সেখানে আরেকটি চাল যোগ করলেন। তারপরেও কি কেউ একে চালের স্তূপ বলা যাবে? সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ ই একে চালের স্তূপ বলবে না।

এবার ধরুন আপনি প্রতিবার এভাবে একটি করে চাল যোগ করে যাচ্ছেন। সাধারণভাবে মাত্র একটা চালের কম-বেশি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। N সংখ্যক চালকে একত্রে রাখা হলে যদি চালের স্তূপ না হয়, তাহলে একটা বাড়িয়ে N+1 সংখ্যক চাল নিয়েও স্তূপ হবে না।

আবার যদি বিপরীতভাবে চিন্তা করেন যে যদি N সংখ্যক চালের সমাবেশকে স্তূপ বলা যায়, তাহলে তার থেকে একটা চাল কমিয়ে N-1 করা হলেও স্তূপ হবে। একটা চালে কি আর "স্তূপ নয়" থেকে "স্তূপ আছে" তৈরি করতে পারে? অথচ চোখের সামনে হামেশাই যে তো চালের স্তূপ হতে দেখা যায়।


৮। হ্যাংম্যান প্যারাডক্স

একজন বন্দীকে বলা হল যে সোমবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে কোন এক দিন তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে, তবে কোন দিন ঘটনাটি ঘটবে তা সে জানতেও পারবে না। এখন বন্দী চিন্তা করে দেখলেন তাকে শুক্রবার ফাঁসিতে ঝুলানো যাবে না, কারণ তিনি যদি বৃহস্পতিবার বেঁচে থাকেন তবে তিনি জেনে যাবেন যে শুক্রবারে তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে, কিন্তু তাকে বলা হয়েছে যে তিনি তার ফাঁসির দিনটি আগে থেকে জানতেই পারবেন না। আবার তাকে বৃহস্পতিবারও ফাঁসি দেওয়া যাবে না কারণ তিনি জেনে গেছেন যে শুক্রবার তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না, অর্থাৎ বুধবারেই তিনি বুঝে ফেলবেন যে বৃহস্পতিবার তার ফাঁসি দেওয়া হবে। কিন্তু এটিও শর্তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তার মানে বৃহস্পতিবারও তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না। একই শর্তে তিনি দেখতে পারলেন যে সোম থেকে শুক্র কোন দিনই তাকে ফাঁসি দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু তারপরও শুক্রবার বাদে কোন একদিন ঠিকই তার ফাঁসি কার্যকর হল।

এই প্যারাডক্সটি আরও বিভিন্নভাবে প্রচলিত আছে। অনেকে একে সারপ্রাইজ টেস্ট প্যারাডক্স হিসেবেও জানি। যেমন ধরা যাক, শিক্ষক এসে ক্লাসে ঘোষণা করলেন, আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিনে সারপ্রাইজ টেস্ট নেয়া হবে। ছাত্ররা তখন ভাবতে শুরু করল টেস্টটা কখন হতে পারে। ছাত্রদের মধ্যে একজন বলে উঠল সারপ্রাইজ টেস্ট হওয়া সম্ভব না।

পরীক্ষা বৃহস্পতিবারে হতে পারবে না। কারণ সপ্তাহের শেষদিন পর্যন্ত যদি অপেক্ষা করা হয় তাহলে তা আর সারপ্রাইজ থাকবে না। বুধবার বিকালেই সবাই টের পেয়ে যাবে পরের দিন পরীক্ষা। আবার বুধবারেও পরীক্ষা নেয়া অসম্ভব। কারণ বৃহস্পতিবারকে বাদ দিলে তো মঙ্গলবার বিকালেই জানা হয়ে গেলো বুধবার পরীক্ষা। অর্থাৎ আর সারপ্রাইজ থাকলো না। একইভাবে মঙ্গল, সোম কিংবা রবিবারেও পরীক্ষা নেয়া সম্ভব না।


৯। ইন্টারেস্টিং নাম্বার প্যারাডক্স

এই প্যারাডক্সটি আসলেই ইন্টারেস্টিং। আপনি প্রতিটি সংখ্যাতেই ইন্টারেস্টিং কোন ফ্যাক্ট খুঁজে পাবেন। যেমন আমরা গণনা করি ১ থেকে, আর ১ হল প্রথম অশূন্য সংখ্যা। এরপর ২ হল সবচেয়ে ছোট মৌলিক সংখ্যা। ৩ হল প্রথম মৌলিক বিজোড় সংখ্যা। ৪ হল ক্ষুদ্রতম কম্পোজিট সংখ্যা। একইভাবে আপনি প্রতিটি সংখ্যাতেই কোন না কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাবেন। এভাবে এগুতে এগুতে ধরুন আপনি এমন কোন সংখ্যা পেলেন যার প্রকৃত অর্থে কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই, তাহলে বিশেষ বৈশিষ্ট্য না থাকাটাই হবে সংখ্যাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছাড়া কোন সংখ্যাই নেই।


১০। হ্যাঁ-না প্যারাডক্স

এমন কিছু প্রশ্ন আছে যাদের উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না দ্বারা দেওয়া যাওয়া যায় না। হ্যাঁ বা না দিয়ে উত্তর করতে গেলেই তৈরি হয় মূল প্যারাডক্স। যেমন ধরুন, আপনি সিগারেট খান না। কিন্তু আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে আপনি কি আগের মতই সিগারেট খান তাহলে কি উত্তর করবেন?

যেহেতু আপনি কখনোই সিগারেট খেতেন না তাই এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলার কোন প্রশ্নই আসে না। তাহলে অস্বীকার করার জন্য যদি না বলেন তাহলেও কিছুটা গণ্ডগোল বেধে যাবে। যদি না বলেন তাহলে বোঝাবে আপনি এখন খান না কিন্তু আগে খেতেন।


১১। আগন্তুক ও নগররক্ষী প্যারাডক্স

এই প্যারাডক্স টি কিন্তু আপনার জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। কিভাবে? চলুন দেখে নেওয়া যাক।

ধরুন একটি শহরের একটি অদ্ভুত নিয়ম চালু আছে। কেউ যদি ওই শহরে প্রবেশ করতে চায় তাহলে তাকে নগররক্ষী জিজ্ঞাস করে যে সে কেন এই শহরে এসেছে। উত্তর সত্য হলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় না। কিন্তু উত্তর যদি মিথ্যা হয় তাহলে আগন্তুক কে ঝুলতে হবে ফাঁসিতে।

একদিন এমনই একজন আগন্তুক এলো শহরটিতে। যথারীতি নগররক্ষী তাকে জিজ্ঞাস করলেন তিনি এই শহরে কেন এসেছেন। আগন্তুকের শহরের অদ্ভুত নিয়মটি সম্পর্কে আগে থেকেই ধারনা ছিল। তাই সে ভেবে উত্তর দিল যে তিনি ফাঁসিতে ঝুলতে এসেছেন। উত্তরটি শুনে নগররক্ষী তো পরে গেলেন বিপদে। কারণ তিনি যদি আগন্তুকের উত্তর সত্য বলে ধরে নেন তাহলে আগন্তুক সত্যিই ফাঁসিতে ঝুলতে এসেছেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী কেউ সত্য বললে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় না। আবার যদি উত্তরটি মিথ্যা ধরে নেন তাহলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে হবে। কিন্তু তা হলে তো আগন্তুক এর কথাটি আবার সত্যি হয়ে গেল।


১২। সত্য-মিথ্যা প্যারাডক্স

ধরুন একটি কার্ডের দুইপাশে দুটি বাক্য লেখা আছে। একপাশে লেখা আছে যে "অপর পাশের লেখাটি সত্য"। আবার অপর পাশে লেখা আছে যে "অপর পাশের লেখাটি মিথ্যা"। তাহলে এখন ভাবুন কিছুক্ষণ যে কোন বাক্যটি সত্য।


১৩। নাপিত প্যারাডক্স

ধরুন এক গ্রামে শুধু মাত্র একজন নাপিত আছেন। তিনি শুধুমাত্র তাদেরই দাড়ি কাটেন যারা নিজেদের দাড়ি নিজে কাটতে পারেন না।। আবার নাপিতের নিজের দাড়ি সবসময় কামানো থাকত। তাহলে নাপিতে দাড়ি কে কাটত?


১৪। রেস্টুরেন্ট প্যারাডক্স

ধরুন একটি শহরে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। এখন কেউ যদি ওই রেস্টুরেন্টে কেউ যায় না কারণ রেস্টুরেন্টে সবসময় খুব ভিড় থাকে। তাহলে প্রশ্ন হল কেউ যদি ওই রেস্টুরেন্টে না যায় তাহলে সেখানে ভিড় হল কিভাবে?


১৫। সক্রেটিসের প্যারাডক্স

সক্রেটিসের একটি বিখ্যাত প্যারাডক্স আছে। তার একটি বিখ্যাত উক্তি হল "আমি কিছুই জানি না"। কথাটি ভাল করে লক্ষ করলে বুঝতে পারবেন যে প্যারাডক্সটি কোথায়। যদি তার কথাকে সত্য ধরেন তার মানে তিনি সত্যিই কিছু জানেন না। কিন্তু তাহলে তো তার জানা টা সত্য প্রমাণিত হল, যা কি না জানার মধ্যে পরে। আবার তার কথাটি কে যদি মিথ্যা ধরে নেন তাহলে তার অর্থ দাঁড়াবে তিনি অনেক জানেন, যা কি না তার উত্তরের সাথে সংঘাতপূর্ণ।


১৬। কোন খামটি নেবেন?

ধরুন আপনার সামনে দুটি খাম রাখা আছে। আপনাকে বলা হল খাম দুটির একটিতে যে টাকা রাখা আছে অপরটিতে তার দ্বিগুণ টাকা রাখা আছে। যদি আপনাকে এদের মধ্যে একটি খাম কে নিতে বলা হয় তাহলে আপনি কোন খামটি নেবেন?

মনে করুন, আপনি যে খামটি তুললেন তাতে ১০০০ টাকা আছে। এখন আপনার মনে হল যে আপনি যে খামটি তুলেছেন সেটিতেই বেশি টাকা রাখা আছে। তার মানে অপর খামটিতে ৫০০ টাকা আছে। কিন্তু এও তো হতে পারে যে আপনার খামটিতেই কম টাকাটা রাখা আছে আর অপর খামটিতে দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা আছে।


১৭। দ্যা টুইন প্যারাডক্স

টুইন প্যারাডক্সটি মূলত আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের একটি উদাহরণ। সময়ের আপেক্ষিকতা দিয়েই মূলত এই ঘটনাটি তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তবে আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে এটি সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা।

প্যারাডক্সটি ব্যাখ্যার জন্য দুই যমজ ভাই বিবেচনা করা যাক। ধরা যাক তাদের বয়স ১৮ বছর। এখন এদের মধ্যে একজন স্পেস সিপে করে মহাশূন্য ভ্রমণে গেলেন। তার স্পেশশিপের গতি আলোর বেগের কাছাকাছি। অপর যমজ পৃথিবীতেই থেকে গেলেন। তাহলে একজন আরেকজনের সাপেক্ষে গতিশীল, আর এরকম পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব হয় সময়ের আপেক্ষিকতার। অর্থাৎ স্পেশশীপের যমজ টি যদি তার সময়ের হিসেবে ২ বছর পর ফিরে আসেন তাহলে পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখবেন পৃথিবীতে ২ বছরের চেয়ে অনেক বেশি সময় চলে গেছে। মজার ব্যাপার হল তিনি ফিরে এসে দেখবেন তার যমজ ভাই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এই ঘটনা কে মূলত প্যারাডক্স বলা হলেও বাস্তবে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে একটি সত্য ঘটনা।


১৮। অ্যাবিলিন এর প্যারাডক্স

টেক্সাসের কোলেম্যানে এক গরম বিকেলে এক পরিবার বারান্দায় স্বাচ্ছন্দ্যে ডোমিনোস খেলছিল। পরিবারের সদস্য দুই স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের শ্বশুর-শাশুড়ি। তাদের মধ্যে শ্বশুর টি প্রস্তাব দিলেন যে তারা রাতের খাবারের জন্য অ্যাবিলিনে [৫৩ মাইল উত্তরে] গেলে কেমন হয়। স্ত্রী (বউমা) বলে উঠলেন, "দারুণ আইডিয়া, চলুন যাওয়া যাক। স্বামী টি এই গরমে এত দুরে ড্রাইভ করার ধকলের কথা ভেবে খানিকটা বিচলিত হলেও এই ভেবে রাজি হলেন যে তার উচিত তার পরিবার কে সময় দেওয়া এবং তাদের সাথে থাকা। শাশুড়ি তখন বললেন, “অবশ্যই আমি যেতে চাই। আমি অনেক দিনেই অ্যাবিলিনে যাইনি।"

এরপর এমন উত্তপ্ত দিনে দীর্ঘ ও ধুলাবালির ভ্রমণ শেষে যখন ডিনার করতে নিলেন তখন দেখলে খাবার তাদের ভ্রমণের মতই বাজে হয়েছে। অবশেষে তারা ক্লান্ত হয়ে চার ঘণ্টা পরে ঘরে ফিরে আসে।

তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠেন, "এটি একটি দুর্দান্ত ভ্রমণ ছিল, তাই না?" কিন্তু শ্বাশুরি বলে উঠলেন, এর চেয়ে বরং ঘরে থাকলেই তিনি ভাল করতেন, শুধু অন্য তিনজনের এত উত্সাহ দেখে তিনি রাজী হয়েছিলেন। স্বামী বললেন, "আমারও কোন ইচ্ছা ছিল না, শুধু বাকিদের সন্তুষ্ট রাখতেই গিয়েছিলাম”। এবার স্ত্রী বলে উঠলেন, “আমিও আপনাদের খুশি রাখতেই কেবল গিয়েছিলাম, এমন উত্তাপে বাইরে যাওয়ার মত পাগল নাকি আমি" এবার শ্বশুর বলে উঠলেন, "আমি তো শুধু প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম এই ভেবে যে তোমারা হয়তো ঘরে বসে বিরক্ত হচ্ছ।

তাহলে ঘটনাটি কেমন দাঁড়াল? তারা এমন একটি ভ্রমণ করল যাতে তাদের কারোরই আগ্রহ ছিল না।


১৯। বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স

ধরুন একজন টাইম ট্রাভেলার একটি বই এর দোকান থেকে "হ্যামলেট" এর একটি কপি কিনলেন। এরপর তিনি টাইম ট্রাভেল করে অতিতে শেক্সপিয়ারের সময় ফিরে গেলেন যখন তিনি তখনো হ্যামলেট রচনা করেন নি। টাইম ট্রাভেলার এরপর শেক্সপিয়ারের সাথে দেখা করে তার কেনা হ্যামলেট বই টি উপহার দিলেন। শেক্সপিয়ার বইটি হুবহু কপি করে নিজের নামে ছাপিয়ে বাজারে প্রকাশ করলেন। স্বাভাবিকভাবেই শত শত বছর ধরে এই বইটি প্রকাশিত হতে থাকবে এবং বিভিন্ন বই এর দোকানে বিক্রি হতে থাকবে। আর এমন একটি বই এর দোকান থেকেই টাইম ট্রাভেলারটি বই টি কিনেছিলেন এবং শেক্সপিয়ারকে দিয়ে এসেছিলেন। তাহলে এখন প্রশ্ন হল, কে হ্যামলেট লিখেছিল?


২০। খুনি কে?

তিন-বন্ধু মরুভূমি তে বেড়াতে গেল। তারা তিনজন বন্ধু হলেও তিনজন পরস্পরকে প্রচণ্ড হিংসা করত। মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে তারা পথ হারিয়ে ফেলল এবং নিরুপায় হয়ে একটি বুদ্ধি করল যে তিন বন্ধু তিন দিকে রওনা দেবে যাতে একদিকে গিয়ে তিন-বন্ধু একসাথে না মরে। আবার হিংসা থাকার কারণে ১ম ও ২য় বন্ধু পৃথক পৃথক ভাবে ৩য় বন্ধু কে গোপনে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছন। প্রথম বন্ধু ৩য় বন্ধুর পানিতে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে যেন সে বিষ খেয়ে মারা যায়। আর ২য় বন্ধু ৩য় বন্ধুর পানির বোতলে একটি ছিদ্র করে দিয়েছে যাতে পানির অভাবে সে রাস্তায় মারা যায়।

যথারীতি ৩য় বন্ধুটি মারা গেলে ১ম ও ২য় বন্ধুকে কোর্টে হাজির করা হয়। কিন্তু ১ম বন্ধু তার অপরাধ অস্বীকার করে এই বলে যে তার দেওয়া বিষে বন্ধুটি মারা যায় নি কারণ বোতলে ফুটো থাকার কারণে সে এই পানি পান ই করেন নি। এরপর ২য় বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে ও তার দোষ অস্বীকার করে বলে যে স অপরাধী নয়। কারণ পানিতে বিষ থাকার কারণে তিনি তার বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য বোতলে ফুটো করে দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন হল, কে ৩য় বন্ধুকে হত্যা করল।

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট 

কমেন্ট বক্সে লেখাটি সম্পর্কে আপনার মূল্যবান মতামত জানান 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. ধন্যবাদ। প্যারাডক্স সম্পর্কিত আরও লেখা পড়তে চাই।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ আমাদের সাথে থাকার জন্য। আশা করি ভবিষ্যতে এরকম আরো লেখা আপনাদের সামনে নিয়ে আসতে পারব আমরা।

      মুছুন

If it seems any informative mistake in the post, you are cordially welcome to suggest fixing it.